খালি চোখে পানিতে ডুব দিলে পানির ভিতরের বস্তুর প্রতিচ্ছবি ঘোলাটে দেখায় কারণ পানির প্রতিসরাঙ্কের কারণে চোখের ফোকাস দূরত্ব পরিবর্তন হয়ে যায়। এতে বস্তু থেকে আলোকরশ্মি চোখের রেটিনার সামনে বা পিছনে মিলিত হয়, এ কারণে পানির ভিতরের বস্তুর প্রতিচ্ছবি ঘোলাটে দেখায়।
অবতল লেন্সে বাস্তব বিম্ব গঠিত হয় না। সর্বদাই অবাস্তব এবং খর্বিত বিম্ব পাওয়া যায়। বস্তুর যেকোনো অবস্থানের জন্য অবাস্তব ও খর্বিত প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। বস্তুকে লেন্সের যত কাছেই রাখা হোক না কেন বিম্ব কখনোই বস্তুর আকারের সমান হবে না। অবাস্তব বিম্ব পর্দায় ফেলা যায় না। তাই অবতল লেন্সে গঠিত প্রতিবিম্ব পর্দায় উৎপন্ন হয় না।
উভোত্তল লেন্স দ্বারা আলোক রশ্মিকে অপসারী করা যায়। আলোক উৎস যখন উভোত্তল লেন্সের প্রধান ফোকাসের ভিতরে অবস্থান করে তখন লেন্সটি আলোক রশ্মিকে অপসারী করে।
লেন্স প্রস্তুতকারী সমীকরণ অনুসারে, আমরা জানি, \( \frac{1}{f} = (\mu - 1)\left(\frac{1}{r_1} - \frac{1}{r_2}\right) \)। এই সম্পর্ক থেকে দেখা যাচ্ছে যে, লেন্সের ফোকাস দূরত্ব লেন্সের প্রতিসরাঙ্কের উপর নির্ভর করে। আবার, জানা আছে— প্রতিসরাঙ্ক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যস্তানুপাতিক এবং একেক বর্ণের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য একেক। সুতরাং একেক বর্ণের আলোর জন্য লেন্সের উপাদানের প্রতিসরাঙ্ক একেক হওয়ায় এর ফোকাস দূরত্বও ভিন্ন। অতএব, লেন্সের ফোকাস দূরত্ব আপতিত আলোর বর্ণের উপর নির্ভরশীল।
বীক্ষণ কোণের জন্য দূরে অবস্থিত গাছপালা ছোট দেখায়। একটি বস্তু কত বড় দেখাবে তা প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করে বীক্ষণ কোণের উপর। অর্থাৎ \( b = a\theta \) কিন্তু রেটিনা হতে চক্ষু লেন্সের দূরত্ব \( a \) নির্দিষ্ট হওয়ায় \( b \propto \theta \)। সুতরাং \( \theta \) এর মান যত ছোট হয় প্রতিবিম্বের দৈর্ঘ্য \( b \) ও তত ছোট হয়। কোনো বস্তু আমাদের চোখ থেকে যত দূরে অবস্থান করে বীক্ষণ কোণও তত কম হয়। অর্থাৎ দূরে অবস্থিত গাছপালা আমাদের চোখে কম মানের বীক্ষণ কোণ তৈরি করে। এজন্য দূরে অবস্থিত গাছপালা ছোট দেখায়।
সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বিবর্ধনের সমীকরণ হলো— \( M = 1 + \frac{D}{f} \)। এই সমীকরণ হতে দেখা যায় যে, স্পষ্ট দর্শনের ন্যূনতম দূরত্ব \( D \) এর মান সুনির্দিষ্ট। অর্থাৎ \( M \) এর মান \( f \) এর উপর নির্ভরশীল। সমীকরণ অনুসারে ফোকাস দূরত্ব \( f \) এর মান হ্রাস পেলে বিবর্ধন \( M \) এর মান বৃদ্ধি পায়।
আমরা জানি, অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দুটি লেন্স আছে। যথাক্রমে অভিলক্ষ্য ও অভিনেত্ৰ। অভিলক্ষ্যে বিম্ব বাস্তব ও উল্টো হয় ফলে এর বিবর্ধন ঋণাত্মক কিন্তু অভিনেত্রের চূড়ান্ত বিম্ব অবাস্তব হয় ফলে এর বিবর্ধন ধনাত্মক হয়। ফলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের চূড়ান্ত বিবর্ধন, \( M = (-m_1)(m_2) = -m_1m_2 \) অর্থাৎ ঋণাত্মক হয়।
অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মোট বিবর্ধন হচ্ছে অভিলক্ষ্য ও অভিনেত্রের বিবর্ধনের গুণফল। ফলে একটির বিবর্ধন অপরিবর্তিত রেখে অপরটির বিবর্ধন বাড়লে মোট বিবর্ধন বাড়ে। অভিলক্ষ্যের বিবর্ধন সমীকরণ থেকে আমরা পাই, \( -\frac{v_o}{u_o} = -\frac{v_o}{f_o} + 1 \)। এই সম্পর্ক থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান যে, অভিলক্ষ্যের ফোকাস দূরত্ব \( f_o \) কমালে এর বিবর্ধন বাড়ে। ফলে উপরোক্ত সম্পর্ক অনুসারে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বিবর্ধনও বৃদ্ধি পায়।
অণুবীক্ষণ যন্ত্র ও দূরবীক্ষণ যন্ত্রের গঠনগত পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো—
১। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে অভিনেত্রের সাপেক্ষে অভিলক্ষ্যের লেন্সের উন্মেষ ও ফোকাস দূরত্ব ছোট হয়। অপরদিকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে অভিনেত্রের সাপেক্ষে অভিলক্ষ্য লেন্সের ফোকাস দূরত্ব ও উন্মেষ বড় হয়।
২। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে অভিলক্ষ্যে লক্ষ্যবস্তুর প্রতিবিম্ব তার ফোকাস দূরত্ব অপেক্ষা অধিক দূরত্বে গঠিত হয়। অপরদিকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রে অভিলক্ষ্যে লক্ষ্যবস্তুর প্রতিবিম্ব তার ফোকাস তলে গঠিত হয়।
আকৃতি দেখে অণুবীক্ষণ ও দূরবীক্ষণ যন্ত্র শনাক্ত করা সম্ভব। কারণ এদের গঠনে ভিন্নতা রয়েছে। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে, দুটি উত্তল লেন্স একটি ধাতব নলের দুই প্রান্তে একই অক্ষ বরাবর বসানো থাকে। দূরবীক্ষণ যন্ত্রে দুটি উত্তল লেন্স দুটি টানা নলের সাহায্যে একটি ধাতব চোঙের দুই প্রান্তে সমান্তরালে স্থাপন করা হয়। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের অভিনেত্রের ফোকাস দূরত্ব ও উন্মেষ অপেক্ষাকৃত বড়। অপরদিকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের অভিলক্ষ্যের ফোকাস দূরত্ব ও উন্মেষ অপেক্ষাকৃত বড় হয়।
সাদা আলো সাতটি বর্ণের সমষ্টি। এ সাতটি বর্ণের প্রতিটি বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ভিন্ন ভিন্ন। যে বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বেশি সে বর্ণ তত কম বাঁকে। এজন্য সাদা আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে গমন করলে প্রতিসৃত রশ্মিগুলো ভিন্ন ভিন্ন কোণে বিচ্যুত হয়ে প্রিজমের দিকে বেঁকে যায়, অর্থাৎ মৌলিক বর্ণে পৃথক বা বিচ্ছুরিত হয়।
সরু প্রিজমের ক্ষেত্রে আলোক রশ্মির বিচ্যুতি কোণের মান প্রিজমের প্রতিসারক কোণ ও প্রিজম পদার্থের প্রতিসরাঙ্কের উপর নির্ভর করে। যেসব প্রিজমের প্রতিসারক কোণ \( 6^\circ \) এর চেয়ে ছোট তাদের সরু প্রিজম বলে। সরু প্রিজমের উপর একটি রশ্মি খুব ছোট কোণে আপতিত হলে অর্থাৎ প্রায় লম্বভাবে আপতিত হলে বিচ্যুতি কোণ, \( \delta = i_1 + i_2 - A \)। হিসাব শেষে পাওয়া যায়, \( \delta = (\mu - 1)A \)। অর্থাৎ সরু প্রিজমের ক্ষেত্রে, আলোকরশ্মির বিচ্যুতি প্রিজম কোণের উপর নির্ভর করে।
দৃশ্যমান আলোর মধ্যে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি এবং বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। প্রতিসরাঙ্ক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যস্তানুপাতিক হওয়ায় লাল আলোর জন্য প্রতিসরাঙ্ক সবচেয়ে কম এবং বেগুনি আলোর জন্য সবচেয়ে বেশি। সরু প্রিজমের বিচ্যুতির রাশিমালা \( \delta = (\mu - 1)A \)। এই সমীকরণ অনুসারে বিচ্যুতি প্রতিসরাঙ্কের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ প্রিজমের বিচ্যুতি আলোর বর্ণের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
লাল আলোর কম বিচ্যুতির কারণে বিপদ সংকেতে লাল আলো ব্যবহার করা হয়। মৌলিক দৃশ্যমান আলোসমূহের মধ্যে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি এবং কাচের মধ্যে লাল রঙের বেগ সবচেয়ে বেশি। তাই লাল আলো অন্যান্য বর্ণের আলোর তুলনায় সবচেয়ে কম বাঁকে, অর্থাৎ বায়ুর মধ্য দিয়ে লাল রঙের আলোর বিচ্যুতি সবচেয়ে কম। তাই বিপদ সংকেতে লাল আলো ব্যবহার করা হয়।
বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের অণু কর্তৃক সূর্যালোকের বিক্ষেপণের জন্য আকাশ নীল দেখায়। বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণা সূর্যালোককে বিক্ষিপ্ত করতে পারে; সেক্ষেত্রে ধূলিকণার আকার দৃশ্যমান আলোর দীর্ঘতম তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর হওয়া প্রয়োজন। বিক্ষিপ্ত আলোর তীব্রতা তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের চতুর্থ ঘাতের ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়। ফলে সূর্যালোকের নীল রশ্মি লাল রশ্মি অপেক্ষা বেশি বিক্ষিপ্ত হয়। এজন্য আকাশের দিকে তাকালে আকাশ নীল দেখায়।