মুক্ত ইলেকট্রন প্রবাহের সময় পরিবাহকের অণু পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ কারণে পরিবাহকের রোধের উদ্ভব ঘটে। তাপমাত্রা বাড়লে পরিবাহকের অণু পরমাণু অতিরিক্ত শক্তি পায়। এতে তাদের কম্পনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে মুক্ত ইলেকট্রনের সাথে এদের সংঘর্ষ বৃদ্ধি পায় এবং প্রবাহ চলার পথে বেশি বাধার সৃষ্টি হয়। এতে করে পরিবাহকের রোধ বৃদ্ধি পায়। তাই বলা যায়, পরিবাহীর রোধ তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল।
নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় একক দৈর্ঘ্য ও একক প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট কোনো পরিবাহীর রোধকে আপেক্ষিক রোধ বলে। বিভিন্ন পদার্থের আপেক্ষিক রোধ বিভিন্ন। কারণ আপেক্ষিক রোধ পরিবাহীর উপাদানের উপর নির্ভর করে। যে পদার্থের আপেক্ষিক রোধের মান বেশি সেই পদার্থের পরিবাহিতা কম, পরিবাহীর উপাদানের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণে আপেক্ষিক রোধের মান বিভিন্ন হয়। এ কারণে একই তাপমাত্রায় ভিন্ন উপাদানবিশিষ্ট পরিবাহীর আপেক্ষিক রোধ ভিন্ন হয়।
কোনো পরিবাহীর পরিবাহিতা 0.2 সিমেন্স বলতে বুঝায় ঐ পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য 1 ভোল্ট হলে তার মধ্য দিয়ে 0.2 A তড়িৎ প্রবাহ চলে এবং পরিবাহীর রোধ \( (1 \div 0.2) \, \Omega = 5 \, \Omega \)।
নিকেলের রোধের উষ্ণতা সহগ \( 6 \times 10^{-3} \, ^\circ\text{C}^{-1} \) বলতে বুঝায় যে \( 1 \, \Omega \) রোধ বিশিষ্ট কোনো নিকেল পরিবাহীর তাপমাত্রা \( 1 ^\circ\text{C} \) বৃদ্ধি পেলে এর রোধ \( 6 \times 10^{-3} \, \Omega \) বৃদ্ধি পাবে।
তামার আপেক্ষিক রোধ \( 1.56 \times 10^{-8} \, \Omega\text{m} \) বলতে বুঝায় 1 m দৈর্ঘ্য ও \( 1 \, \text{m}^2 \) প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট তামার তারের রোধ হবে \( 1.56 \times 10^{-8} \, \Omega \)।
আমরা জানি, পরিবাহীর রোধের উষ্ণতা সহগ ধনাত্মক। সুতরাং, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে পরিবাহীর রোধ বৃদ্ধি পায়। আবার, আমরা জানি, বিভব পার্থক্য অপরিবর্তিত থাকলে পরিবাহীর প্রবাহমাত্রা \( I \) তার রোধের ব্যস্তানুপাতিক, \( I = \frac{V}{R} \therefore I \propto \frac{1}{R} \)। যেহেতু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রোধ বৃদ্ধি পায়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রবাহমাত্রা কমে যাবে।
পরিবাহীতে তড়িৎ প্রবাহের সময় পরিবাহী উত্তপ্ত হয়। ধাতব পরিবাহীতে অণুগুলো স্থির নয়। এরা সর্বদা কম্পনরত অবস্থায় থাকে। পরিবাহীর মধ্যে মুক্ত ইলেকট্রনের প্রবাহের ফলে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়। মুক্ত ইলেকট্রন প্রবাহের সময় পরিবাহীর অণু পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ফলে পরিবাহীতে রোধের উদ্ভব ঘটে। এ কারণে প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে পরিবাহী উত্তপ্ত হয়। অর্থাৎ প্রবাহ চলাকালে পরিবাহীতে তাপ উৎপন্ন হয়।
বৈদ্যুতিক বাতির গায়ে '100 W - 220 V' লেখা থাকলে এর অর্থ হল 220 V বিদ্যুৎ উৎসের সাথে যুক্ত করলে এটি সর্বাধিক উজ্জ্বলতায় আলো দেবে। 100 W কথার অর্থ হলো বাতিটি প্রতি সেকেন্ডে 100 J বিদ্যুৎ শক্তি ব্যয় করে।
পরিবহনের সময় তড়িতের কিছু পরিমাণ লস অর্থাৎ ক্ষয় হয়। একে তড়িতের সিস্টেম লস বলে। আমরা জানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য যে সকল পরিবাহী তার ব্যবহার করা হয় তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রোধ থাকে। ফলে এ রোধকে অতিক্রমের জন্য তড়িৎশক্তির একটি অংশ তাপে রূপান্তরিত হয় অর্থাৎ লস বা ক্ষয় হয়।
আমরা জানি, এক একক ধনাত্মক আধানকে কোনো পরিবাহকের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে স্থানান্তর করতে যে কাজ সম্পন্ন হয় তাই ঐ বিন্দুর বিভব পার্থক্য কিন্তু একক ধনাত্মক আধানকে কোষসহ কোনো বর্তনীর একবিন্দু থেকে সম্পূর্ণ বর্তনী ঘুরিয়ে আবার ঐ বিন্দুতে আনতে যে কাজ সম্পন্ন হয় তাই ঐ কোষের তড়িচ্চালক শক্তি। বিভব পার্থক্য হলো তড়িচ্চালক শক্তির ফল এবং তড়িচ্চালক শক্তি হলো বিভব পার্থক্যের কারণ। এজন্য বলা যায়, কোনো বর্তনীতে তড়িচ্চালক শক্তি ও বিভব পার্থক্য এক নয়।
আমরা জানি, কোষের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র মানের একটি রোধ কার্যকর থাকে। একে কোষের অভ্যন্তরীণ রোধ বলা হয়। কোষকে যখন বহিস্থ কোনো বর্তনীর সাথে যুক্ত করা হয় তখন কোষের এই অভ্যন্তরীণ রোধের মধ্য দিয়েও কিছু বিভব পতন ঘটে যা কোনো কাজে আসে না। এজন্য বর্তনীতে কোষের তড়িচ্চালক বল সম্পূর্ণ কার্যকর হয় না।
হারানো ভোল্টেজ 2 V বলতে বুঝায়- কোষকে বর্তনীতে যুক্ত করলে 2 V বিভব কোষের অভ্যন্তরে নষ্ট হয়। অর্থাৎ কোষকে বর্তনীতে যুক্ত করার পর এর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য এর তড়িৎ চালক শক্তি হতে 2 V কম পাওয়া যায়।
কম অভ্যন্তরীণ রোধবিশিষ্ট একাধিক ব্যাটারিকে শ্রেণিতে যুক্ত করলে বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহ পাওয়া যাবে। আমরা জানি, শ্রেণি সমবায়ে তড়িৎ প্রবাহ, \( I = \frac{nE}{R + nr} \)। যদি \( R >> nr \) হয়, তবে \( I \approx n \times \frac{E}{R} \) হবে। অর্থাৎ, তড়িৎ প্রবাহ একটি কোষের প্রবাহের \( n \) গুণ হবে। তাই বলা যায়, কম রোধবিশিষ্ট একাধিক ব্যাটারিকে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করলে বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহ পাওয়া যাবে।
\( r \) অভ্যন্তরীণ রোধ বিশিষ্ট \( n \) সংখ্যক কোষ সমান্তরালে সংযুক্ত করে বহিস্থ কোনো রোধ \( R \) এর সাথে যুক্ত করলে বর্তনীর তড়িৎপ্রবাহের সমীকরণ দাঁড়ায়, \( I = \frac{E}{R + \frac{r}{n}} = \frac{nE}{nR + r} \)। এখন উচ্চ অভ্যন্তরীণ রোধের ক্ষেত্রে, \( r >> nR \)। সুতরাং সমীকরণটি লেখা যায়, \( I = n \times \frac{E}{r} \) [nR উপেক্ষণীয়]। অর্থাৎ তড়িৎপ্রবাহ যেকোনো একটি কোষের তড়িৎপ্রবাহের \( n \) গুণ। অতএব, উচ্চ অভ্যন্তরীণ রোধ বিশিষ্ট একাধিক ব্যাটারির সমান্তরাল সংযোগে বেশি বিদ্যুৎপ্রবাহ পাওয়া যায়।
কার্শফের প্রথম সূত্র থেকে আমরা পাই, বিদ্যুৎ বর্তনীর কোনো সংযোগ বিন্দুতে মিলিত প্রবাহমাত্রাগুলোর বীজগাণিতিক যোগফল শূন্য হয়। আবার আমরা জানি, প্রবাহমাত্রা হলো চার্জের প্রবাহ। এখন সংযোগ বিন্দুতে প্রবাহমাত্রাগুলোর যোগফল যদি শূন্য না হয় তাহলে ঐ বিন্দুতে চার্জের সৃষ্টি বা ধ্বংস হওয়া বুঝায়। যা চার্জের নিত্যতা সূত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তবে বর্তনীর কোথাও চার্জ সঞ্চিত হতে পারে না। কিন্তু এই সূত্রানুসারে \( \sum I = 0 \)। অর্থাৎ কার্শফের প্রথম সূত্র চার্জের সংরক্ষণ নীতি মেনে চলে।
যখন, হুইটস্টোন ব্রিজের B ও D বিন্দুর বিভব সমান হয় অর্থাৎ \( V_B = V_D \) হয় তখন গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো তড়িৎ প্রবাহিত হয় না। ফলে গ্যালভানোমিটারের কাঁটা কোনো বিক্ষেপ দেয় না। এই অবস্থাকে হুইটস্টোন ব্রিজের ভারসাম্য অবস্থা বা নিস্পন্দ অবস্থা বলে। হুইটস্টোন ব্রিজের ভারসাম্য অবস্থায় \( \frac{P}{Q} = \frac{R}{S} \) হয়। ফলে এই অবস্থায় হুইটস্টোন ব্রিজের যেকোনো তিনটি বাহুর রোধ জানা থাকলে চতুর্থ বাহুর অজানা রোধ জানা যায়।
গ্যালভানোমিটারকে অতিরিক্তপ্রবাহ থেকে রক্ষা করতে এর সাথে সমান্তরালে যুক্ত অল্পমানের রোধককে শান্ট বলে। অন্যদিকে, ফিউজ একটি বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ডিভাইস যা কোনো বৈদ্যুতিক সার্কিটে শ্রেণিতে যুক্ত থাকে এবং অতিরিক্ত কারেন্ট প্রবাহিত হলে নিজে গলে গিয়ে সার্কিট বিচ্ছিন্ন করে যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করে। অর্থাৎ, শান্ট নিজের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত কারেন্ট প্রবাহিত করে অন্য যন্ত্রকে রক্ষা করে, অন্যদিকে ফিউজ অতিপ্রবাহে নিজে নষ্ট হয়ে যন্ত্র রক্ষা করে। অর্থাৎ, শান্ট ও ফিউজ একই নয়।
অধিক পরিমাণ প্রবাহ গিয়ে যাতে গ্যালভানোমিটার বা সূক্ষ্ম ও সুবেদী বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে নষ্ট করতে না পারে তার জন্য যন্ত্রের সাথে সমান্তরালে স্বল্প মানের যে রোধ যুক্ত করা হয় তাই শান্ট। শান্টের প্রধান কাজ হলো গ্যালভানোমিটারের বিদ্যুৎ প্রবাহ হ্রাস করে একে অতি বিদ্যুৎপ্রবাহজনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। শান্টকে বর্তনীতে সমান্তরালে সংযোগ দেওয়া হয় যাতে অতিরিক্ত প্রবাহ শান্টের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এখন শান্টের রোধ শূন্য হলে সম্পূর্ণ প্রবাহই শান্টের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হবে, গ্যালভানোমিটারের মধ্য দিয়ে কোনো বিদ্যুৎই প্রবাহিত হবে না। অন্যদিকে শান্টের রোধ অসীম হলে সম্পূর্ণ প্রবাহই গ্যালভানোমিটারের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হবে ফলে শান্ট ব্যবহারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই শান্টের রোধের মান শূন্য বা অসীম হয় না।
অধিক পরিমাণ প্রবাহ গিয়ে যাতে সংবেদনশীল যন্ত্র বা সূক্ষ্ম ও সুবেদী বৈদ্যুতিক যন্ত্রকে নষ্ট করতে না পারে তার জন্য যন্ত্রের সাথে সমান্তরালে স্বল্প মানের যে রোধ যুক্ত করা হয় তাই শান্ট। শান্টের প্রধান কাজ হলো সংবেদনশীল যন্ত্রের বিদ্যুৎ প্রবাহ হ্রাস করে একে অতি বিদ্যুৎপ্রবাহজনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। শান্টকে বর্তনীতে সমান্তরালে সংযোগ দেওয়া হয় যাতে অতিরিক্ত প্রবাহ শান্টের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এজন্য সংবেদনশীল যন্ত্রে শান্টের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি。
ফিউজ একটি রোধক যার গলনাঙ্ক কম। বাসা বাড়িতে বৈদ্যুতিক বর্তনীতে এটি ব্যবহার করা হয়। আমরা জানি, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহের দরুন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়। বর্তনীতে ফিউজ না থাকলে প্রয়োজনের বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহমাত্রায় এটি ঘটে থাকে। ফিউজ থাকলে প্রয়োজনের বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহমাত্রা থাকলে ফিউজটি কেটে যায় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে যন্ত্রপাতি রক্ষা পায়। এ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্যই বর্তনীতে ফিউজ ব্যবহার করা হয়।
নিরাপত্তা ফিউজ হলো একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের চিকন তার যা বৈদ্যুতিক বর্তনীতে অধিক তড়িৎপ্রবাহ প্রতিরোধের জন্য জীবন্ত তারে সংযোগ দেওয়া হয়। নিরাপত্তা ফিউজে বিশুদ্ধ ধাতু ব্যবহার করলে এর মধ্য দিয়ে অধিক পরিমাণে তড়িৎ প্রবাহ ঘটলে তারটি অক্ষত থাকবে ফলে এই অধিক তড়িৎপ্রবাহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ক্ষতিসাধন করবে। এতে নিরাপত্তা ফিউজ ব্যবহারের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। এজন্যই নিরাপত্তা ফিউজে বিশুদ্ধ ধাতু ব্যবহার করা হয় না।